Friday, July 11, 2014

আমারও মন পড়ে থাকে

আমারও মন পড়ে থাকে


উদয় শংকর দুর্জয় 

আমারও তো মন পড়ে থাকে 
শিকড়ে লাগে টান 
মেঠো সুর দখিনা সমীরণ হৃদয়ে 
উজানেতে তুলে পাল 

জ্যোৎস্নার ফুল কুয়াশা ভেজা মন 
বকুল বিশুদ্ধ ঘ্রণ 
সোনা ঝরা ক্ষেত বিপুল বৈভব 
আবেগে মাতাল প্রাণ 

বৃষ্টির মেঘ কাদামাটি পথ 
কৃষকের প্রিয় উদ্যান 
পাখি রব রূপোলী ভোর যত 
হৃদয় বড্ড উচাটান 

নির্ঘুম রাত সময় ফ্রেমে বাঁধা 
বিষণ্ণ মন দূরাকাশ 
তবু এপারে অধেক বেঁধেছি বাসা 
সুখবিসুখ এই পরবাস

আমাকে যত্ন করে খোলার মন্ত্র জানো?



কবিতা মানে কল্পনার পর্বতে বসা গর্দভের অলস অপকর্ম!
এমনটাই বলা হয়েছিল আমায় ৷
অথচ আমি জানি,
কবিতা মানে জীবনের কার্নিশে দাঁড়িয়ে জীবন দেখা ৷
যেন প্লাবিত বন্যায় ভেসে থাকা সংগ্রামী কাগুজে নৌকা ৷

কবিতা মানে বিহৎ বিশ্বের এককালীন বিশ্বনাশ ৷
সফেদ ফেনার আস্তরে ঢাকা জলের সঙ্গীতে বাস ৷
কবিতা মানে হৃদয়ে খোদিত অনবরত শব্দের ইতিহাস ৷

কবিতা মানে শ্মশানের পাশেই গড়ে ওঠা পানশালা ৷
কবিতা মানে সক্রেটিসের পোষা দৈত্য ' লেলু'র চুম্বক কথামালা ৷

কবিতা মানে রোমের দুঃসময়ে বাজানো নিরোর হর্ষ বেহালা ৷
কবিতা মানে কৌমুদী রাতে চিত্ত ক্ষুধার জ্বালা ৷

কবিতা মানে ক্রোধে জ্বলে ওঠা চেতনার অগ্নিশিখা ৷
কবিতা মানে সামাজিকতার ঐক্য -অনৈক্যের জরাবস্থা ৷

কবিতা মানে মানবতার পরমায়ু আর রক্ত-সংলগ্ন যক্ষ্মা ৷
শোষণের প্রতিবাদে ক্রমে গড়ে ওঠা মধুমক্ষিকা- রচিত বাসা ৷

কবিতা মানে জীবনের ভবিষ্যত আর ভবিষ্যতের ভূতপূর্বাবস্থা ৷
কবিতায় নীতিবোধ, সভ্যতা আর তারুণ্যের দ্রোহের ক্ষমতা ৷

কবিতা মানে উদ্দীপ্ত আবেগে দীপ্ত বামপন্থী বস্তুবাদের সূত্র ৷
ফুটপাতের অনাহারের প্রতিবাদে বিলাসী অপচয়ের প্রথাবিরুদ্ধতার মন্ত্র ৷

কবিতা মানে রক্ত মাংস থেকে জন্ম নেয়া একটি ভালোবাসা, একটি শিশু 
কিংবা সংবেদনহীন কঠিন শিলা, শূণ্যতায়ও যার হারাবার নেই কিছু ৷

কবিতা মানে ধবধবে শাড়ি পড়া নারীর বিসর্জন ৷
কবিতা মানে তোমার আমার খুনসুটি অকারণ ৷

কবিতা মানে প্রথম বৃষ্টিতে ভেজা চুম্বনরত ঠোঁট ৷
কবিতা মানে থীবসের মন্দিরে দাঁড়িয়ে থাকা দেবী টাইকের অন্ধ দুচোখ ৷

তাই আহবান করি—
যদি কবিতার বিশালতাকে বুঝতে চাও ,ভালোবাসতে চাও; 
তবে এসো, কাব্যের শব্দকে করো অনুভব ৷
সবল, দুর্বল প্রতিটি শব্দ প্রবল আগ্রহে জানতে চায় ;
আমাকে কী বুঝ ? আমাকে যত্ন করে খোলার মন্ত্র জানো? 

যদি না বুঝ,তবে এড়িয়ে যাও ৷দুর্বৃত্তের মতো হানা দিওনা ৷
চাবি ছাড়া সিন্দুক ভাঙ্গা যায় ৷
শব্দানুভূতি ছাড়া কবিতা বোধগম্য নয় ৷

আঙরার আগুন

আঙরার আগুন

ভ্রান্তি বিলাসে তোমাদের ধুমায়িত সন্ধ্যা
আমি বরং ঘুমিয়ে থাকি
তোমরা সুখে রও।
হৃদয় পচা গন্ধের উৎপাতে
অপদস্ত আমার স্বতন্ত্র নিবাস
আরক্তিম চোখের বিষাক্ত ছোবলে
আহত ভঙ্গুর পথ।
জলে স্থলে জন্তু জানোয়ারের সুখ কাড়াকাড়ি
খিলবন্ধ্ বোধি সত্ত্বায় চিল শকুনের আনাগোনা
আর্শ্চয এক ধোঁয়ার গোলক ধাঁধাঁ মানুষ।
তোমাদের শৈল্পিক উঠনে
কোকিল মুখোশের আলোকচিত্র প্রদর্শনী
মেঘের স্পর্শে জ্বলে উঠে
কামাসিক্ত পঙ্গপাল শরীর।
জ্বলন্ত আঙরা দগ্ধ হতে হতে
যদি ঘুম ভাঙ্গে কোন দিন
তোমাদের গ্রাস করবে নিখাদ মৃত্যু ক্ষুধা।

গল্পের খোঁজে


কিছু কথার ফুলঝুরি কি গল্প ? কিংবা শব্দের আনাগোনা ! আজকাল গল্পগুলো কেমন যেন গল্পহীন হয়ে পড়ছে! যেন চমকলাগা কিছু শব্দ ঠেসে দিলে কিংবা অকথ্য/মিশ্রভাষায় কয়েকলাইন লিখলেই হয়ে গেলো গল্প! ভাষার যথেচ্ছ ব্যবহার এতটাই আরোপিত আর কৃত্রিম যে পাঠক মাঝ পথেই খেই হারিয়ে ফেলেন। কখনও কখনও ঘটনার বর্ননা দেখে মনে হয় লেখক হয়ত সংবাদ পরিবেশন করছেন। সাংবাদিক আর লেখকের মধ্যে পার্থক্য বিস্তর। পাঠক একটি সৃজনশীল গল্প পড়তে চাইছেন, কোন সংবাদ নয়। কেউ হয়ত লিখছেন বিদেশের কোন পটভূমিতে কিন্তু সেটাকে যদি 'অনুবাদ গল্প' থেকে আলাদা করা না যায় তাহলে কিন্তু আর গল্প হয়ে ওঠে না। এইসব গল্পের ক্ষেত্রে ইংরেজি বা অন্যভাষার শব্দের ব্যবহার মাত্রা ছাড়িয়ে গেলো কিনা সেটাও ভেবে দেখার বিষয়।
বাংলায় প্রতিদিন কতশত গল্পই না লেখা হচ্ছে। তারমাঝে কিছু সাহিত্যনির্ভর গল্প এবং উপন্যাস নিশ্চয়ই আছে। আর সেই ভাল গল্পটির খোঁজে আমরা পড়ছি পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। বই, লিটলম্যাগ, ব্লগ, সাহিত্যপাতা। কিন্তু কোথায় সেই গল্প! অতীতের সাথে তুলনা করলে সেটাকে অপ্রতুলই বলা চলে।
আগে ছুটির দিনে বাড়িতে পত্রিকা এলেই সাহিত্যপাতাটি ছিল সবচাইতে কাঙ্খিত পাতা। আজকাল সেই পাতা উল্টে যায় এক নিমিশেই ।
লেখক ও পাঠক সবাই অল্পতেই তুষ্ট ! 'প্রিয়' আর 'লাইক', আর কি চাই এ জগতে ?
তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে অনেক লেখক তৈরি হচ্ছে ঠিকই কিন্তু একজন সৃজনশীল লেখক হওয়ার পেছনে চিন্তার বিকাশ, শিল্পমান, ভাষার সৌন্দর্য সর্বপরি তাঁর স্বতন্ত্র অবস্থানের ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে।

নস্টালজিয়া...

 শহর থেকে একটু দুরে লাক্কাতুরা মালনীছড়ার টিলা
সেই টিলাতে হারিয়ে যেতাম,রোজ বিকেলে আমি এবং নীলা।
নুড়িপাথর পা’য় মাড়িয়ে,সরু পথে একটু গিয়ে বামে
আমরা দুজন হারিয়ে যেতাম,রোজ বিকেলে লুকোচুরির নামে।
শিরিষ গাছের চিরল পাতায় শেষ বিকেলে সূয্যের্র আলো পড়ে
সবুজ বনে অবুঝ মনে ভালোলাগার সুবাস দিতো ভরে।
খেলার ছলে দুজন মিলে বন জঙ্গলে হারিয়ে গেলে রোজ
মা ভাইয়েরা বকতো ভীষন, সন্ধ্যা হলে করতো সবে খোঁজ।
বুঁনো ফুলের গন্ধ ভরা,বাঁধন ছাড়া সেদিন গুলো কই?
অট্রালিকার ভীড়ে এখন,সে সব মনে পড়লে অবাক হই।
উথাল পাথাল ছন্দ মাতাল হারিয়ে যাওয়া সেই কিশোরীর মন
আমায় ডাকে হাত ইশারায় সকাল দুপুর সন্ধ্যা সারাক্ষন
নীলা নামের সেই কিশোরীর আজ জানিনা কোন সুদুরে বাস
কিন্ত তাকে পড়লে মনে, আমার উঠে উথলা নিঃশ্বাস...।

বিবর্তনের অপেক্ষায়

বিবর্তনের অপেক্ষায়

ইচ্ছের নাটাইটাকে গুটিয়ে ফেলি
পরংপরা ধারাবাহিক বিষাক্ত বাতাসে গোত্তা খেয়ে
ওড়েনা ঘুড়ি আমার, হয় নিস্তেজ আরো!
ক্ষুদ্র একটি বিশ্ব আমার
মাঝে মাঝে মন বলে-
ইচ্ছের বোতলে ভরে তুলে রাখি শিকেয়
এবং অপেক্ষা করি আরেকটা মহা-বিষ্ফোরণের---!

নতুন যাত্রা হবে শুরু অযুত কোটি বছরের-
আবার শুন্য থেকে হবে শুরু মহাশুন্যে
নতুন সূর্য্য দেবে অন্য রকম কোনেো কীরণ
অন্য রকম কোনো এ্যামিবার জন্ম দেবে জলরাশি
অবশেষে এবার বানর নয়
অন্য কিছু থেকে শুরু হবে মানব-ইতিহাস
গন্ধম নয়, 
অন্য কোনো বিষাক্ত ফল ভক্ষন দিয়ে শুরু হবে নতুন বিশ্বের
মানবিক পরংপরা
নর আর নারী লিঙ্গাশ্রয়ী জটিল এইসব রামায়ন কৃষ্ণ-লীলা
ভগবান বুদ্ধ ঈশ্বর আবহে আশ্রিত নাম-জপ দেবতা-তুষ্টি--
সব শেষ হোক ঈশ্বর
আর পারিনা বইতে তোমার অদৃশ্য ভাইরাস-যুক্ত সোহাগ
আমার ইচ্ছের নাটাইটাকে জীবন-গোগলে এ্যাক্‌টিভেট্‌ করতে দাও
নতুবা নিষ্ক্রিয় হও তুমি
সেই ভালো-
আমি ভাইরাস-মুক্ত আরেকটা বিগ্‌-ব্যাঙ্গ এর অপেক্ষায় থাকি!

-গোলাম কবির
(বো রোড, লন্ডন, ৩জুন ২০১৪)

নবদ্বীপ: আলোচ্য-ধ্বনি

# মেহেরুন্নেছা চৌধুরী, যাঁর পরম স্নেহ-মমতা আমাকে শৈশবের সোনা ঝরা রোদ-সকাল মনে করিয়ে দেয়।

সু-স্নাত রহে-সুরমা, কুশিয়ারা ও সুনাই। উত্তরের ঘাটে ‘ব সদা থাকেন যে কানাই। দক্ষিণে বড়লেখা, পশ্চিমেতে গোলাপগঞ্জ। পূর্বেতে সীমানা লাগে ভারত-করিমগঞ্জ।.
কতই অনাদি সবুজাভ পাতার ছায়ায়, নানান ত্রিভুজ সাহিত্য বর্ণিত উপমায়। মানব প্রাণীজ সাবলীল নি?াপ মায়ায়, যে জননী-জনকের সুগভীর বেদনায়। বড় অচেনা শহরের ভেতরের শহর, কেটেছে অনেক রাত্রি যেথা-সহস্র প্রহর। কোন মলাটে বসেনি মন, হয়নি-কো ঠাঁই, এই অখণ্ড অবেলায় আরাধ্য জুটে নাই।প্রচলিত প্রবাদের মাঝে যেনও না হয় কোনও মিথ অথবা উৎসের ধারণা। অসাম্প্রদায়িক অঞ্চল হিসেবে গৌরবের শতবর্ষ সংখ্যায়-যোগ হবে ঊপভাষিক পূর্তি পর্ব। পঞ্চখণ্ডের সেতুবন্ধন হয়ে ষষ্ঠ খণ্ড বেঁচে থাক-পৃথিবীর সবখানে। যেমনি নদীর ঢেউ-নিয়তঃ ধুয়ে যায় জল-সীমানার মাটি। গণভোট বিষয়ক বাস্তবতায় এখনো পোষ্ট অফিস রোড খোলা থাকে.. মনে রাখে-বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, আকাদ্দস্ সিরাজের শব্দায়নের শ্লোগান-সিম্ফনি।
কৃতজ্ঞতার অনেকগুলো কায়া-বোতাম খোলে; বহুবিধ সংহতির জনপদ এখনো জেগে থাকে। জন্ম সিঁড়ি শুধুই নামে; চির চেনা নৈবেদ্য উচ্চারণে, রূপায়িত রূপ আছে-পঙতি-পয়ারে, অনবদ্য প্রাণে। উজান আছে, ভাটি আছে, আছে অনেক ঐতিহ্য-প্রথা। বিমূর্ত জল রঙে মোর হোম-টাউন সাজিয়েছেন বিধাতা।হে জন্ম-নগর আমার-এক সূর্যমুখী দিন .. ফিরে আসে-বেড়ে ওঠা ঘন-টিলা ঘেরা গাঁয়। যেথায় শুয়ে আছেন আদি পূর্বপুরুষ- বনি পরম্পরায়।

দ্যুতি

দ্যুতি

কে তুমি লাবণ্যময়ী? তুমি কি যাদুমন্ত্রে
করেছ বশীভূত আমায়!
কুহেলিকা কোনো?
মায়াজালে বিস্তার করো সমগ্র আমাকে?
কী এমন সুষমামণ্ডিত অপার সৌন্দর্যের খনি
প্রলেপ দিয়েছে মেখে তোমার তিনটি অক্ষরের
লাবণ্যময় শরীরে?

পৃথিবীর সবচেয়ে মনোহারী নাম, সবচেয়ে
প্রিয় ধ্বনি, সবচেয়ে প্রিয় নাম 'লাবণ্য' আমার
তোমাকে কিভাবে অভিষিক্ত করি?
তোমার নামের ঐশ্বর্যে লাবণ্যমণ্ডিত হই আমি
সিক্ত অনুরাগে রঞ্জিত হয় আমার আনন্দ-বেদনা
মধুর-বিধুর হৃদয়ের অন্তরতমা!

তোমার প্রতিটি অক্ষর ছুঁয়ে যায়
আমার নিমগ্ন ধ্যানের রোমাঞ্চিত শরীর!
তাই হৃদয়ের সবটুকু উষ্ণতা দিয়ে নিশিদিন  
ব্যাপৃত থাকি তোমার পরিচর্যায়, তোমার
সুবর্ণ পালক রাখি ঝলমলে উজ্জ্বল পরিপাটি করে।

তোমাকে রক্ষা করি আমি ধূলোর প্লাবন থেকে,
তোমাকে আগলে রাখি আমি আলোর কড়া
উত্তাপ থেকে
একটি হীরকখণ্ডের মত তোমাকে রাখি আমি
হৃদয়ের নিভৃতে সবচেয়ে গোপন সিন্দুকে গুপ্তধনের
মহিমায়!

'লাবণ্য' নামটি তুমি যেন একান্তই আমার!
তাইতো বাইরের এই আলোকিত পৃথিবীর মানুষের
সামনে তোমাকে বের করে আনতে চাইনে আমি,
এই বুঝি অপহৃত হয়ে যাবে তুমি! কোনো
কাব্যিক দস্যু এসে নিয়ে যাবে তোমাকে আমার
কাছ থেকে!

তোমার নামের স্বর্ণের হার পরিয়ে দেবে কোনো
নবজাতিকার কন্ঠদেশে!
আমি যেন পরশ্রীকাতর, স্বার্থপরের মত তোমাকে
আগলে রাখি!

আমার হৃদয়ের উত্তাপ আর স্নেহের শীতল ছায়ায়
তুমি আমাতেই হও বিকশিত! লাবণ্য আমার প্রিয়
দ্যুতিময় নাম।

তোমাকে কীভাবে দিই আমার হৃদয়ের আবেগ?
ভালোবাসার নাকি প্রেমের?
স্নেহের ফল্গুধারার নাকি মমতার মায়াবী আঁচল?
নাকি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলী?

যেভাবেই হোক তোমাকে রেখেছি বুকে একটি জনম
আমি উষ্ণতার নিবিড় আবেগে
বিনিময়ে তুমি দাও আমাকে
প্রতিদিন আনন্দের
অশ্রুবিন্দু, বিষাদের শিশির,
একখণ্ড মেঘ, নীলিমার
নীল ধ্রুবতারা।

শেষের কবিতার মত এক অনিঃশেষ কবিতা!

হয়ত এমনি হয়

হয়ত এমনি হয়

হয়ত এমনি হয় 

দেখেছো সত্যব্রত 
দোপাটির বনে এখন শুঁয়োপোকাদের উৎসব , 
কল্কে ফুল জড়িয়ে আছে স্বর্ণলতা অথচ 
ওর পাশে রক্তজবা কিংবা কামিনী
মনিয়ে যেত বেশ ; 
ঝোপের ওপাশে শুয়ে আছে ময়াল সাপ
ওর মুক্ত আবাসটা এখনো ভয় হয়ে ঝুলে আছে 
আমাদের বোধের আঙিনায়। 
হয়তো এমনই হয় 
জড়াজড়ি করে থাকে ঐশ্বর্য আর বিবমিষা 
এভাবেই কিছু কিছু পথ এসে হারায় 
গলির অন্ধকারে ... 
সময়ে নলখাগড়াও মসৃণ পথকে 
করে তোলে অগম্য বন্ধুর ...

স্মৃতির পালক/আহমেদ ফয়সাল

শৈশবের রঙ-ছড়ানো দুপুরে
অলস আষাঢ় বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে শুকোয়
বলতে তুমি- শিয়াল মামার বিয়ে
‘পণ্ডিতের ভাগ্নের বন্ধু, কী ভাগ্য বলো!
’রেগে যেতে তুমি
বন্ধু মনে পড়ে খুব ...

কবি আবু মকসুদের ‘মৃত্তিকার মেঘলা ভ্রমণ’


কবি আবু মকসুদের ‘মৃত্তিকার মেঘলা ভ্রমণ’
কবি আবু মকসুদের জন্ম ১৯৭০ সালে, মৌলভীবাজারে। ১৯৮৭ সাল থেকে তিনি বিলেত প্রবাসী। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও নেশায় দারুণভাবে একজন সৃজনশীল লেখক। তাঁর লেখালেখির শুরু আশির দশকের শেষভাগে। ছড়া দিয়ে শুরু হলেও, ওখানেই আবদ্ধ থাকেননিÑ পাশাপাশি লিখছেন কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ। সম্পাদনা করছেন চমৎকার একটি সাহিত্য কাগজ ‘শব্দপাঠ’। এই কাগজের সঙ্গে আরো দু’জন কীর্তিমান কবি সংযুক্ত রয়েছেনÑ তাঁরা হলেন বিলেত প্রবাসী আতাউর রহমান মিলাদ ও কাজল রশীদ। যতোটা জানি, এঁরা তিনজন বিলেতে শুদ্ধ সাহিত্য-চর্চা করছেন।
কবি আবু মকসুদ দীর্ঘদিন ধরে লিখছেন বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং আসামের বিভিন্ন সাহিত্যের কাগজগুলোতে। ইতোমধ্যে ছড়া, কবিতা ও সম্পাদনাসহ প্রায় নয়টি প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থসমূহ হলোÑ ন’টার ট্রেন ক’টায় ছাড়ে (ছড়া), মিথ্যাবাদী রাখাল ছেলে (ছড়া), একটি গুলি (ছড়া), দূরতর গ্রহজীবন (কবিতা), ক্রমাগত ঘুমের উনুন (কবিতা), খনিজ ভুলের কাছে জমা রাখি জলের মোহর (কবিতা), বিলেতের ছড়া (সম্পাদনা) ও তৃতীয় রাংলার কবি ও কবিতা (সম্পাদনা)। আর এ বছর প্রকাশিত হলো চমৎকার নামের কবিতাগ্রন্থ ‘মৃত্তিকার মেঘলা ভ্রমণ’।
‘মৃত্তিকার মেঘলা ভ্রমণ’ গ্রন্থের ফ্ল্যাপে সত্তরের অন্যতম প্রধান কবি আসাদ মান্নান বলেছেন, ‘নব্বই দশকের একজন উল্লেখযোগ্য প্রকৃত কবি আবু মকসুদ। তিনি ‘মৃত্তিকার মেঘলা ভ্রমণ’ কাব্যগ্রন্থে এক রহস্যময় জগৎ নির্মাণ করেছেন খাঁটি আধুনিক কবির দৃষ্টিতে। কবিতা নির্মাণের যে গোপন সূত্র তিনি প্রয়োগ করেছেন তা আপাতদৃষ্টিতে অলঙ্কারবিহীনÑ উপমা, উৎপ্রেক্ষার ভাওে আক্রান্ত নয়। মুক্ত গদ্যে রচিত এসব কবিতার মূল অবলম্বন অতিপরিচিত শব্দরাশি আর কবির টুকরো টুকরো ভাবনাÑ ভাবের চেয়ে ভাবপ্রধান এসব কবিতা। পাঠ করলে বুঝা যায় যে ভাবনাও একজন কবি অনায়াসে একটা রহস্যময় জগতে পাঠককে অন্যরকম এক মুগ্ধতায় খামচে ধরে। একজন কবি বলতে যা বুঝায় আবু মকসুদ তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তার এ গ্রন্থের কবিতাসমূহে আমি বা তুমির উপস্থিতি নেই বললেই চলে। ব্যক্তি কবিকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। রুচি ও ভাবনায় একজন পূর্ণাঙ্গ সচেতন আন্তর্জাতিক মানুষ বলেই এভাবে আমিত্বকে অনায়াসে দূরে রাখতে পেরেছেন মকসুদ। সন্দেহ নেইÑ এটি একজন কবির বড় সাফল্য, যা মকসুদ অর্জন করেছেন প্রজ্ঞাদীপ্ত মননশীলতার নিরলস চর্চার মধ্য দিয়ে। ফলে কবিতাগুলো হয়ে উঠেছে সব বোদ্ধপাঠকের কবিতা। ভাবনার সঙ্গে ভাবনাকে নিপুণ দর্জির মতো সেলাই দিয়ে মকসুদ চমৎকার এক শব্দের নকশীকাঁথা তৈরি করেছেন ‘মৃত্তিকার মেঘলা ভ্রমণ’ গ্রন্থে চিরকালীন এক রহস্যের জাল বিস্তার করে যাবে প্রকৃত কাব্য পাঠকের মনে।
’ কবি আসাদ মান্নান প্রকৃত পাঠ পর্যালোচনায় আবু মকসুদের নতুন এই গ্রন্থের কবিতাসমূহ নিয়ে প্রকৃত কথাই উপস্থাপন করেছেন। আমরা এবার পর পর কয়েকটি কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে সত্যতা প্রমাণ করার চেষ্ঠা করছি :
১. প্রিয় মৃত্তিকা/ সঞ্চালিত জলে/ সাঁতার শেষ হলে/ ভূমি স্পর্শের প্রার্থনায়/ আমাদের আহাজারি/ তার কানে পৌঁছালে/ সে বাড়ায় বন্ধুত্বের হাত? হাত অনুসরণ করে/ আমরা মাড়াই সন্ধ্যার মাঠৃ।
২. প্রিয় মৃত্তিকা/ বাদামী ত্বকের খেদে/ হৃদয় জর্জরিত হলে/ মন ছুটে মলমের খোঁজে/ ফেয়ার এন্ড লাভলির লোভনীয়/ অফার ত্বকে প্রলাপ দিলে/ ভাবি রঙ বদলের মলমে/ ঘটবে কি খেদের উপশমৃ।
৩. প্রিয় মৃত্তিকা/ কবিতার ছাউনি দিয়ে হেঁটে যাবে বলে/ ছুটে আসছি/ হেঁটে যাওয়া পথ থেকে কুড়াবে/ ধ্বনি, প্রতিধ্বনি হয়ে তারা/ ছড়িয়ে পড়বে বেলাভূমেৃ।
৪. প্রিয় মৃত্তিকা? সমবেত পদধ্বনির সাথে/ আন্দোলনের সংযোগ দেখাতে/ হাত উত্তোলনের/ প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হলে/ দেরী হয়ে যায়/ জলপাই ট্রাকের দাপটে দিশেহারা পিচের রাস্তাৃ।
৫. প্রিয় মৃত্তিকা/ পার্কের বেঞ্চে বাদামের খোসা/ ছাড়াতে ছাড়াতে আদম যুগলেষু/ চাকার কথা ভাবে, দ্বৈত চাকা/ কতদূর নিয়ে যাবে, আদৌ কি যাবে ভাবতে ভাবতে/ তারা দেখে পার্কের ঘাসে পোকারা ভীড় করেছেৃ।
৬. প্রিয় মৃত্তিকা/ যে জীবনে মকসুদ নামে কেউ হাঁটে/ তাকে ধরতে চাই, নাগালে এলে জিজ্ঞেস করে/ জেনে নিতে চাই, কেমন দামে কিনেছে এমন জীবন? চাইলেই কি পাওয়া যাবে/ অথবা একটা আপোস সমঝোতায় কি/ জীবন বিনিময় হতে পারে!
৭. প্রিয় মৃত্তিকা/ চামড়ার কি মনে পড়ে একদিন মসৃণ ছিল/ ময়ূরীর মখমল পেখমে/ বাসনারা ভীড় করত, পুচ্ছের পিছনে/ সারিবদ্ধ মানুষের বাসনা দীর্ঘ হলে/ ময়ূরী যেত আয়েশ নগরে/ শহরের জাঁকজমক পাড়ায়/ নিয়নের আলো বেড়াতে এলে/ ময়ূরীর ডাক পড়ত, তাদের মেহমান/ হয়ে দিনগুরি রাঙাতে থাকলে/ দূরের নদী-ঘাট স্বজন হারানোর বেদনায়/ কাঁদত, নিয়েনর মোহে অঘোর ময়ূরী/ ভুলে যেত নদী-ঘাটে মোমের জন্মকথা/ নদী ঘাটগুলোও আজ উঠে গেছে/ জন্মকথা পড়ে আছে, চামড়ার ভাঁজে ভাঁজে/ স্মৃতির সেলাই হয়ে আছে মোমের আলো/ ময়ূরী শুধু নেই মোমে কিংবা নিয়নের আলোয়।
৮. প্রিয় মৃত্তিকা/ গল্পের শেষে যখন ওপাড় খুঁজতে যাবে দেখবে কেউ নেই, মিথ্যেই এতদূর পাড়ি দেয়া হয়েছে।
৯. প্রিয় মৃত্তিকা/ সময় হঠাৎ করে সংগীত মুখর হয়ে উঠলো/ মনে কেউ ঢেলে দিল সুর/ পাখি যেমন উদ্বেলিত হয় মুক্তির আনন্দে/ তেমনি ঘন মেঘের আড়ালে সরে/ চরাচরের সবুজে ঝিলিক দিল কাক্সিক্ষত আলোৃ।
১০. প্রিয় মৃত্তিকা/ আমার গ্রামÑ ডাকঘরের অমলের মত, দই ওয়ালার ডাকের অপেক্ষায় জানালার কাছে উদগ্রীব বসে থাকে। কখনো মনে হয় বসে থাকতে অসহ্য বোধ হলে সে উঠে দাঁড়ায়, এদিক ওদিক চেয়ে কেউ দেখছে না নিশ্চিত হলে সোজা হাঁটা দেয়, যতটুকু সম্ভব চোখের আড়াল হয়ে চলে আসে শহরে, আমার খোঁজেই আসে।
‘মৃত্তিকার মেঘলা ভ্রমণ’ গ্রন্থ মোট ৫৬টি কবিতা থেকে ১০টি কবিতার অংশ বিশেষ উপরে তুলে ধরার প্রয়াস পেলাম। প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করবেন, প্রতিটি কবিতা শুরু হয়েছে ‘প্রিয় মৃত্তিকা’ দিয়ে। কবিতাসমূহের আলাদা কোনো শিরোনাম নেই। মনে হয়, ৫৬টিই একটি দীর্ঘ কবিতা। একটি সুতায় এঁটে যেন প্রিয় মৃত্তিকাকে অকাতরে বলেছেন, ‘যে জীবনে মকসুদ নামে কেউ হাঁটে/ তাকে ধরতে চাই, নাগালে এলে জিজ্ঞেস করে/ জেনে নিতে চাই, কেমন দামে কিনেছে এমন জীবন? চাইলেই কি পাওয়া যাবে/ অথবা একটা আপোস সমঝোতায় কি/ জীবন বিনিময় হতে পারে!’ আসলে অন্য রকম আঙ্গিকের আশ্রয় নিয়ে তিনি নিজস্ব ভাবনা-উপলব্ধি-অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে নির্দ্বিধায় ব্যক্ত করেছেন। কবি আসাদ মান্নান যেমনটা বলেছেন, ‘আমি’ বা ‘তুমি’র ব্যবহার ছাড়া মকসুদ অবলীলায় বয়ান করেছেনÑ জগৎ-জীবন আর বৃহত্তর প্রেমানুভূতির কথা। দু’একটি কবিতা বাদে এই কথার প্রমাণ পাওয়া গেছে। মনে রাখতে হবে, কবি আবু মকসুদ বাংলাদেশের গ্রাম, শহর এবং পরবর্তী পর্যায়ে বিলেতে জীবন-যাপন করছেন দীর্ঘ দিন। এই অতিক্রান্ত সময়ে তাঁর কাছে ধরা পড়েছে মানুষের যাপিত জীবন, প্রকৃতি, সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির নানা চরাই-উৎরাই, সংঘাত-দ্বন্দ্ব। তিনি একজন আধুনিক মানুষ। তিনি লালন করেন মহান মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাংলা ভাষা-বাংলাদেশ। যে কারণে মিশ্র-সংস্কৃতির লন্ডনে বাস করেও প্রিয় মাতৃভূমি, মাতৃভূমির মানুষের প্রতি তাঁর দরদ এতটুকু কমেনি। আলোচ্য কাবগ্রন্থের প্রতিটি কবিতার শব্দে শব্দে তার প্রতিফলন রয়েছে। যেন মাইকেলের মত বলছেন, ‘হে বঙ্গ-ভা-ারে তব বিবিধ রতন।
’ কবি আবু মকসুদ তাঁর এই নতুন কবিতাসমূহের মাধ্যমে বাংলা কবিতার নতুন বাঁকের দিকে এগোনোর চেষ্টা করেছেন। গদবাধা ফর্ম থেকে বেরিয়ে কিছুটা এক্সপেরিমেন্ট করার প্রয়াস পেয়েছেন। নব্বইয়ের অন্যান্য কবিদের পাশাপাশি কবিতায় এই নতুন বাঁক ফেরা বলতে হবে আবু মকসুদ বাংলা কবিতাকেই এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তাঁর এই প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানাই।
:: শিহাব শাহরিয়ার মৃত্তিকার মেঘলা ভ্রমণ : আবু মকসুদ প্রকাশক : কোরাস পাবলিশার্স প্রকাশকাল : অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৪ প্রচ্ছদ : রেজুয়ান মারুফ মূল্য : ৮০ টাকা