কবি আবু মকসুদের ‘মৃত্তিকার মেঘলা ভ্রমণ’
কবি আবু মকসুদের জন্ম ১৯৭০ সালে, মৌলভীবাজারে। ১৯৮৭ সাল থেকে তিনি বিলেত প্রবাসী। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও নেশায় দারুণভাবে একজন সৃজনশীল লেখক। তাঁর লেখালেখির শুরু আশির দশকের শেষভাগে। ছড়া দিয়ে শুরু হলেও, ওখানেই আবদ্ধ থাকেননিÑ পাশাপাশি লিখছেন কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ। সম্পাদনা করছেন চমৎকার একটি সাহিত্য কাগজ ‘শব্দপাঠ’। এই কাগজের সঙ্গে আরো দু’জন কীর্তিমান কবি সংযুক্ত রয়েছেনÑ তাঁরা হলেন বিলেত প্রবাসী আতাউর রহমান মিলাদ ও কাজল রশীদ। যতোটা জানি, এঁরা তিনজন বিলেতে শুদ্ধ সাহিত্য-চর্চা করছেন।
কবি আবু মকসুদ দীর্ঘদিন ধরে লিখছেন বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং আসামের বিভিন্ন সাহিত্যের কাগজগুলোতে। ইতোমধ্যে ছড়া, কবিতা ও সম্পাদনাসহ প্রায় নয়টি প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থসমূহ হলোÑ ন’টার ট্রেন ক’টায় ছাড়ে (ছড়া), মিথ্যাবাদী রাখাল ছেলে (ছড়া), একটি গুলি (ছড়া), দূরতর গ্রহজীবন (কবিতা), ক্রমাগত ঘুমের উনুন (কবিতা), খনিজ ভুলের কাছে জমা রাখি জলের মোহর (কবিতা), বিলেতের ছড়া (সম্পাদনা) ও তৃতীয় রাংলার কবি ও কবিতা (সম্পাদনা)। আর এ বছর প্রকাশিত হলো চমৎকার নামের কবিতাগ্রন্থ ‘মৃত্তিকার মেঘলা ভ্রমণ’।
‘মৃত্তিকার মেঘলা ভ্রমণ’ গ্রন্থের ফ্ল্যাপে সত্তরের অন্যতম প্রধান কবি আসাদ মান্নান বলেছেন, ‘নব্বই দশকের একজন উল্লেখযোগ্য প্রকৃত কবি আবু মকসুদ। তিনি ‘মৃত্তিকার মেঘলা ভ্রমণ’ কাব্যগ্রন্থে এক রহস্যময় জগৎ নির্মাণ করেছেন খাঁটি আধুনিক কবির দৃষ্টিতে। কবিতা নির্মাণের যে গোপন সূত্র তিনি প্রয়োগ করেছেন তা আপাতদৃষ্টিতে অলঙ্কারবিহীনÑ উপমা, উৎপ্রেক্ষার ভাওে আক্রান্ত নয়। মুক্ত গদ্যে রচিত এসব কবিতার মূল অবলম্বন অতিপরিচিত শব্দরাশি আর কবির টুকরো টুকরো ভাবনাÑ ভাবের চেয়ে ভাবপ্রধান এসব কবিতা। পাঠ করলে বুঝা যায় যে ভাবনাও একজন কবি অনায়াসে একটা রহস্যময় জগতে পাঠককে অন্যরকম এক মুগ্ধতায় খামচে ধরে। একজন কবি বলতে যা বুঝায় আবু মকসুদ তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তার এ গ্রন্থের কবিতাসমূহে আমি বা তুমির উপস্থিতি নেই বললেই চলে। ব্যক্তি কবিকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। রুচি ও ভাবনায় একজন পূর্ণাঙ্গ সচেতন আন্তর্জাতিক মানুষ বলেই এভাবে আমিত্বকে অনায়াসে দূরে রাখতে পেরেছেন মকসুদ। সন্দেহ নেইÑ এটি একজন কবির বড় সাফল্য, যা মকসুদ অর্জন করেছেন প্রজ্ঞাদীপ্ত মননশীলতার নিরলস চর্চার মধ্য দিয়ে। ফলে কবিতাগুলো হয়ে উঠেছে সব বোদ্ধপাঠকের কবিতা। ভাবনার সঙ্গে ভাবনাকে নিপুণ দর্জির মতো সেলাই দিয়ে মকসুদ চমৎকার এক শব্দের নকশীকাঁথা তৈরি করেছেন ‘মৃত্তিকার মেঘলা ভ্রমণ’ গ্রন্থে চিরকালীন এক রহস্যের জাল বিস্তার করে যাবে প্রকৃত কাব্য পাঠকের মনে।
’ কবি আসাদ মান্নান প্রকৃত পাঠ পর্যালোচনায় আবু মকসুদের নতুন এই গ্রন্থের কবিতাসমূহ নিয়ে প্রকৃত কথাই উপস্থাপন করেছেন। আমরা এবার পর পর কয়েকটি কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে সত্যতা প্রমাণ করার চেষ্ঠা করছি :
১. প্রিয় মৃত্তিকা/ সঞ্চালিত জলে/ সাঁতার শেষ হলে/ ভূমি স্পর্শের প্রার্থনায়/ আমাদের আহাজারি/ তার কানে পৌঁছালে/ সে বাড়ায় বন্ধুত্বের হাত? হাত অনুসরণ করে/ আমরা মাড়াই সন্ধ্যার মাঠৃ।
২. প্রিয় মৃত্তিকা/ বাদামী ত্বকের খেদে/ হৃদয় জর্জরিত হলে/ মন ছুটে মলমের খোঁজে/ ফেয়ার এন্ড লাভলির লোভনীয়/ অফার ত্বকে প্রলাপ দিলে/ ভাবি রঙ বদলের মলমে/ ঘটবে কি খেদের উপশমৃ।
৩. প্রিয় মৃত্তিকা/ কবিতার ছাউনি দিয়ে হেঁটে যাবে বলে/ ছুটে আসছি/ হেঁটে যাওয়া পথ থেকে কুড়াবে/ ধ্বনি, প্রতিধ্বনি হয়ে তারা/ ছড়িয়ে পড়বে বেলাভূমেৃ।
৪. প্রিয় মৃত্তিকা? সমবেত পদধ্বনির সাথে/ আন্দোলনের সংযোগ দেখাতে/ হাত উত্তোলনের/ প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হলে/ দেরী হয়ে যায়/ জলপাই ট্রাকের দাপটে দিশেহারা পিচের রাস্তাৃ।
৫. প্রিয় মৃত্তিকা/ পার্কের বেঞ্চে বাদামের খোসা/ ছাড়াতে ছাড়াতে আদম যুগলেষু/ চাকার কথা ভাবে, দ্বৈত চাকা/ কতদূর নিয়ে যাবে, আদৌ কি যাবে ভাবতে ভাবতে/ তারা দেখে পার্কের ঘাসে পোকারা ভীড় করেছেৃ।
৬. প্রিয় মৃত্তিকা/ যে জীবনে মকসুদ নামে কেউ হাঁটে/ তাকে ধরতে চাই, নাগালে এলে জিজ্ঞেস করে/ জেনে নিতে চাই, কেমন দামে কিনেছে এমন জীবন? চাইলেই কি পাওয়া যাবে/ অথবা একটা আপোস সমঝোতায় কি/ জীবন বিনিময় হতে পারে!
৭. প্রিয় মৃত্তিকা/ চামড়ার কি মনে পড়ে একদিন মসৃণ ছিল/ ময়ূরীর মখমল পেখমে/ বাসনারা ভীড় করত, পুচ্ছের পিছনে/ সারিবদ্ধ মানুষের বাসনা দীর্ঘ হলে/ ময়ূরী যেত আয়েশ নগরে/ শহরের জাঁকজমক পাড়ায়/ নিয়নের আলো বেড়াতে এলে/ ময়ূরীর ডাক পড়ত, তাদের মেহমান/ হয়ে দিনগুরি রাঙাতে থাকলে/ দূরের নদী-ঘাট স্বজন হারানোর বেদনায়/ কাঁদত, নিয়েনর মোহে অঘোর ময়ূরী/ ভুলে যেত নদী-ঘাটে মোমের জন্মকথা/ নদী ঘাটগুলোও আজ উঠে গেছে/ জন্মকথা পড়ে আছে, চামড়ার ভাঁজে ভাঁজে/ স্মৃতির সেলাই হয়ে আছে মোমের আলো/ ময়ূরী শুধু নেই মোমে কিংবা নিয়নের আলোয়।
৮. প্রিয় মৃত্তিকা/ গল্পের শেষে যখন ওপাড় খুঁজতে যাবে দেখবে কেউ নেই, মিথ্যেই এতদূর পাড়ি দেয়া হয়েছে।
৯. প্রিয় মৃত্তিকা/ সময় হঠাৎ করে সংগীত মুখর হয়ে উঠলো/ মনে কেউ ঢেলে দিল সুর/ পাখি যেমন উদ্বেলিত হয় মুক্তির আনন্দে/ তেমনি ঘন মেঘের আড়ালে সরে/ চরাচরের সবুজে ঝিলিক দিল কাক্সিক্ষত আলোৃ।
১০. প্রিয় মৃত্তিকা/ আমার গ্রামÑ ডাকঘরের অমলের মত, দই ওয়ালার ডাকের অপেক্ষায় জানালার কাছে উদগ্রীব বসে থাকে। কখনো মনে হয় বসে থাকতে অসহ্য বোধ হলে সে উঠে দাঁড়ায়, এদিক ওদিক চেয়ে কেউ দেখছে না নিশ্চিত হলে সোজা হাঁটা দেয়, যতটুকু সম্ভব চোখের আড়াল হয়ে চলে আসে শহরে, আমার খোঁজেই আসে।
‘মৃত্তিকার মেঘলা ভ্রমণ’ গ্রন্থ মোট ৫৬টি কবিতা থেকে ১০টি কবিতার অংশ বিশেষ উপরে তুলে ধরার প্রয়াস পেলাম। প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করবেন, প্রতিটি কবিতা শুরু হয়েছে ‘প্রিয় মৃত্তিকা’ দিয়ে। কবিতাসমূহের আলাদা কোনো শিরোনাম নেই। মনে হয়, ৫৬টিই একটি দীর্ঘ কবিতা। একটি সুতায় এঁটে যেন প্রিয় মৃত্তিকাকে অকাতরে বলেছেন, ‘যে জীবনে মকসুদ নামে কেউ হাঁটে/ তাকে ধরতে চাই, নাগালে এলে জিজ্ঞেস করে/ জেনে নিতে চাই, কেমন দামে কিনেছে এমন জীবন? চাইলেই কি পাওয়া যাবে/ অথবা একটা আপোস সমঝোতায় কি/ জীবন বিনিময় হতে পারে!’ আসলে অন্য রকম আঙ্গিকের আশ্রয় নিয়ে তিনি নিজস্ব ভাবনা-উপলব্ধি-অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে নির্দ্বিধায় ব্যক্ত করেছেন। কবি আসাদ মান্নান যেমনটা বলেছেন, ‘আমি’ বা ‘তুমি’র ব্যবহার ছাড়া মকসুদ অবলীলায় বয়ান করেছেনÑ জগৎ-জীবন আর বৃহত্তর প্রেমানুভূতির কথা। দু’একটি কবিতা বাদে এই কথার প্রমাণ পাওয়া গেছে। মনে রাখতে হবে, কবি আবু মকসুদ বাংলাদেশের গ্রাম, শহর এবং পরবর্তী পর্যায়ে বিলেতে জীবন-যাপন করছেন দীর্ঘ দিন। এই অতিক্রান্ত সময়ে তাঁর কাছে ধরা পড়েছে মানুষের যাপিত জীবন, প্রকৃতি, সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির নানা চরাই-উৎরাই, সংঘাত-দ্বন্দ্ব। তিনি একজন আধুনিক মানুষ। তিনি লালন করেন মহান মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাংলা ভাষা-বাংলাদেশ। যে কারণে মিশ্র-সংস্কৃতির লন্ডনে বাস করেও প্রিয় মাতৃভূমি, মাতৃভূমির মানুষের প্রতি তাঁর দরদ এতটুকু কমেনি। আলোচ্য কাবগ্রন্থের প্রতিটি কবিতার শব্দে শব্দে তার প্রতিফলন রয়েছে। যেন মাইকেলের মত বলছেন, ‘হে বঙ্গ-ভা-ারে তব বিবিধ রতন।
’ কবি আবু মকসুদ তাঁর এই নতুন কবিতাসমূহের মাধ্যমে বাংলা কবিতার নতুন বাঁকের দিকে এগোনোর চেষ্টা করেছেন। গদবাধা ফর্ম থেকে বেরিয়ে কিছুটা এক্সপেরিমেন্ট করার প্রয়াস পেয়েছেন। নব্বইয়ের অন্যান্য কবিদের পাশাপাশি কবিতায় এই নতুন বাঁক ফেরা বলতে হবে আবু মকসুদ বাংলা কবিতাকেই এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তাঁর এই প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানাই।
:: শিহাব শাহরিয়ার মৃত্তিকার মেঘলা ভ্রমণ : আবু মকসুদ প্রকাশক : কোরাস পাবলিশার্স প্রকাশকাল : অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৪ প্রচ্ছদ : রেজুয়ান মারুফ মূল্য : ৮০ টাকা
No comments:
Post a Comment