Friday, July 11, 2014

নাস্তিক আস্তিক সকলের প্রতি




আজ থেকে লন্ডনে শুরু রমজান মাস, কাল থেকে বাংলাদেশে। আমার সকল মুসলিম বন্ধুদের জানাই শুভ- রমজান এবং অমুসলিম বন্ধুদের জানাই শভেচ্ছা--।
রমজান মাসে সবাই রোজা রাখবেন নাকি কেউ কেউ রাখবেন না সেটা যার যার মনেই আছে। আমিতো রাখবোই। কিন্তু কেউ যদি না রাখেন সেটা হতে পারে তার বা তাদের শারিরিক অবস্থার কারনে কিংবা মানসিক দুরবস্থার কারনেও। তবে এ দুটি ভিন্ন কোনো কারনে যদি কেউ রোজা না রাখেন তাহলে বুঝতে হবে যে তিনি বা তারা ইচ্ছে করেই রাখছেন না! হয়তো তাদের ভালো লাগেনা ধর্মের এই বিষয়টা কিংবা পুরো ধর্ম বিষয়টাই। 
আমি কিশোর এবং যৌবনের খানিকটা সময় অবধি যারা রোজা না রাখতো তাদের প্রতি ক্ষিপ্ত মানসিকতায় অগ্ণিচক্ষু প্রদর্শন করতাম। আমাদের রেষ্টুরেন্ট ষাটের দশকে যেটা আজম রেষ্টুরেন্ট এবং পরে আজম হোটেল নামে কুলাউড়ায় খ্যাত ছিলো রোজার দিনে যখন মাঝেমধ্যে পর্দা টানানো অবস্থায় ঢুকতাম তখন এমনকি প্রভাবশালী ব্যাক্তিরাও মুখ ঢেকে রাখতেন অথবা দৌড়ে বেরিয়ে যেতেন। এজন্য বাবার কাছে আমাকে বহুবার গালমন্দ শুনতে হতো। আমার বাবা মরহুম মোবারক আলী ছিলেন মারিফতি ধর্মীয় লাইনের একজন প্রকৃত ভক্ত। নামাজ এবং রোজার বিষয়ে মারিফতি তরিকার অধিকাংশ শাখায় তেমন আকর্ষন নেই। বিশেষ করে মাইজভান্ডারী তরিকায়তো পীর সাহেবরা সাধারনত বলেই থাকেন- মুরশিদ ভজলে বয়াত হলে একটা পর্যায়ে আর নামাজ রোজার প্রয়োজন হয়না! আমার বাবার পীর ছিলেন মাইজভান্ডার শরিফের (নাজিরহাট, চট্টগ্রাম) খলিফা মরহুম শাহ সুফি আব্দুল মান্নান। আমি বহুবার তার বক্তব্য শুনেছি। যাই হোক, আমার বাবা ব্যবসার খাতিরেই তখন উনার খদ্দেরদের পক্ষে আমাকে দিনের বেলায় দোকানে না যেতে নিষেধ করতেন। তখন যাদের আমি দেখতাম তারা কেনো রোজা রাখতেন না তা এখনও আমার কাছে কূয়াশাচ্ছন্ন। এদের অনেককেই দেখতাম ইফতারের সময় টুপি মাথায় গায়ে আতর মেখে একটা বেহেশতী আবেগে বসে সাইরেনের অপেক্ষা করতেন! ইসলামের সমালোচনায় কোনোপ্রকার বিষয়ের অবতারণায় এরাই হতেন মহা ক্ষুব্ধ! এরা আল্লাহ এবং রাসুলের প্রতি কোনো ধরনের অবমাননাকর বক্তব্যকে সইতে পারতেন না! অথচ যে আল্লাহ এবং রাসুলের সৃষ্ট ধর্ম অনুযায়ী রোজা এবং নামাজ মূল করণীয়, তা তারা করছেনা! কাজেই ধরে নেয়া যেতে পারে যে এরা হয় ধর্ম মানেন কিন্তু এসব আবশ্যকীয় প্রথা মানেন না অথবা এরা এসব কিছুই বোঝেন না কিংবা কোনো না কোনোভাবে এরা মনে করেন আসলে ধর্ম মিছে, ধর্ম বেদরকারি। এদের অনেকেই এখন বেচে নেই। যদি এদের হিসেব অনুযায়ী ধর্ম কোনো প্রয়োজনীয় বিষয় না হয়ে থাকে তবেতো কোনো কথা নেই, মৃত্যু পরবর্তি তাদের প্রতি চিরন্তন প্রথানুযায়ী বলার দরকারই পড়েনা " তাদের প্রতি আল্লার ক্ষমা বর্ষিত হোক"!
তবে আমার মনের প্রশ্ন যখন থেকে দানা বেধে উঠতে থাকলো তখন থেকেই রোজা নামাজ, পুজা-ঈদ, স্রষ্টার গুণ-কীর্তন, দেবতার-নবীর গুন-কীর্তন ইত্যাদি ধর্মীয় উপাসনা এবং রীতি-নীতি-প্রথাসমূহের প্রতি গুরুত্ব হারাতে থাকলাম।কিন্তু পাশাপাশি এটাও বুঝতে শুরু করলাম যে এসব বিশ্বের আপামর সরল সাধারন মানুষের বিশ্বাসলব্ধ হৃদয়বৃত্তিক বিষয়ে আঘাত করা ঠিক হবেনা। যে যেভাবে যা বিশ্বাস করে তাই নিয়ে থাকুক, যদি তা মানুষ ও মানবতার কোনোপ্রকার ক্ষতি না করে।কিন্তু হিন্দু মুসলিম খৃস্টান এবং এদের বিভিন্ন শাখা প্রশাখা যেভাবে আল্লা-ভগবান-খৃস্টকে একে অন্যের উপর জোরজবরদস্তি করে চাপিয়ে দেবার মরণঘাতি হিংসায় লিপ্ত রয়েছে তাতে কোনোভাবেই ধর্মকে মানবিক হিসাবের মধ্যে রাখতে পারলামনা!
আমার চিন্তা চেতনায় তাই ধর্মের মূল বিষয় যা হলো- “ঈশ্বরে বিশ্বাস কেন্দ্রিক স্ব স্ব ধর্মের ঈশ্বর (আল্লাহ, ভগবান-ব্রম্ম-বিষনু-মহাদেব--, গড-মেরী-শান্তা, অহোর মজদা প্রভৃতি)কে এবং সেইসব ঈশ্বর কেন্দ্রিক বিধানসমূহকে প্রতিষ্টার জন্য লড়াই (জেহাদ, ক্রুসেড ইত্যাদি)কখনোই মানবতার কল্যাণ করতেই পারেনা বরং অকল্যাণই হয়ে এসেছে, হচ্ছে এবং হতে বাধ্য। তবে তার অর্থ এই নয় যে ঢালাওভাবে ধর্মকারী মানুষকে আঘাত করতে হবে, তিরঙ্কার করতে হবে। তার মানে এই নয় যে ধর্মিয় বিষয়াদি নিয়ে অহেতুক যুক্তিতর্কের অবতারণা করে মানুষের মধ্যে সামাজিক এবং রাষ্ট্রিয় বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে হবে।
আমার মনে যাই থাক আমি পরিবারে রোজা রমজানের আনন্দ (যদিও লন্ডনে সাড়ে আঠারো ঘন্টা না খেয়ে থাকা চাট্টিখানি কথা নয়), ঈদের, শবেবরাত শবেকদরের আনন্দ ইত্যাদি যদি ভাগাভাগি করে নিতে না পারি তাহলেতো আর সামাজিক থাকা যাবেনা। তবে অতিরিক্ত কিছু বাড়াবাড়ি আমার পছন্দ নয়, সেটা আস্তিকেরই হোক আর নাস্তিকেরই হোক। তাই পৃথিবীর যারা নাস্তিক তাদের কাছে আমার নিবেদন-আস্তিকদের সংখ্যাই এখনো অধিক, কাজেই সংখ্যাগুরু মানুষের মনে আঘাত না দিয়ে বৈজ্ঞানিক-বস্তুবাদের সত্যটাকে প্রচার করুন। কোনো দেবতা-নবী বা তাদের কেন্দ্রিক কোনো বিষয়কে নোংরাভাবে উপস্থাপিত না করে কেবলমাত্র সুষ্ঠ যুক্তির মাধ্যমে পরিবেশন করুন। অযথা বিতর্ক বাড়িয়ে মানবিক পরিবেশকে অসুন্দর করবেননা। 
ধন্যবাদ সবাইকে।শুভ রমজান!


-গোলাম কবির
লন্ডন ২৯ জুন ২০১

No comments:

Post a Comment